স্বাধীনতা সংগ্রামে বিপ্লবের বর্ণমালা গীতা

. প্রীতম চট্টোপাধ্যায় 

Gitaস্বাধীনতা লাভের পূর্বে ভারতীয় বৈপ্লবিক-যুগ দীর্ঘ পঞ্চাশ বৎসর ধরে ব্যাপ্ত ছিল। তার কাল ১৮৯৭ সাল থেকে ১৯৪৭ সাল। এই দীর্ঘদিন ব্যাপী বিপ্লবীদের জীবনে গীতার প্রভাব ছিল অনন্য। বর্ণমালা না পড়ে যেমন ভাষার মন্দিরে ঢোকা যায় না; গীতা না পড়েও তেমনি বিপ্লবীর রাজ্যে সে যুগে প্রবেশ করা যেত না। বালক বিপ্লবীর কাছে যে গীতা ছিল একটি অবশ্য পঠনীয় পুস্তক মাত্র, সে গীতাই তরুণ বিপ্লবীর হাতে হয়ে উঠত একটি জ্বলন্ত তরবারি। অর্জুনের ‘গাণ্ডীব’ হয়ে গীতা বিপ্লবীর কাছে আসত। দুর্গম পথের যাত্রায় তাঁকে শক্তি দিত গীতার বাণী; বিশেষ করে গীতার দ্বিতীয় অধ্যায়ের প্রত্যেকটি সূত্র, প্রত্যেকটি অক্ষর।

১৮৯৮ সাল। বিচার-প্রহসন সমাপ্ত হল। দামোদর চাপেকারের বিচার। দামোদরের বিরুদ্ধে হত্যাপরাধের চার্জ। র‌্যান্ডসাহেব পুণার প্লেগ-অফিসার। তাঁকে হত্যা করেছেন এই মহারাষ্ট্রীয় বিপ্লবী।

বিদ্রোহী দামোদর চাপেকারের মৃত্যুদণ্ড উচ্চারিত হল কোর্টে। সহাস্যে দামোদর বললেন- “এই মাত্র! আর কিছু নয়?…”

যথানির্দিষ্ট দিনে পুণা শহরে যারদেলা জেলের ফাঁসির মঞ্চে দামোদর চাপেকার আরোহণ করলেন। হাতে তার ভগবদ্গীতা। এই গীতাখানা বন্দীকে পাঠিয়েছিলেন লোকমান্য তিলক তাঁর আশীর্বাদ ভরে দিয়ে। জেলখানায় দামোদরের নিত্য সঙ্গী ছিল এ বইখানা।

ফাঁসিমঞ্চে দাঁড়িয়ে আছেন মৃত্যুঞ্জয়ী বীর প্রশান্ত নয়নে। মৃত্যু আসছে তাঁর দিকে বন্ধুর বেশে, সহচরের আনুগত্যে। কণ্ঠ রোধ করল ফাঁসির নির্মম রজ্জু। ঝুলে পড়ল মৃত্যুহীনের দেহ। কিন্তু হাত থেকে তখনো গীতাখানি খসে পড়েনি।

এইভাবে একটি নয়, একই মার বুক থেকে পর পর তিনটি ভাই ঝরে গেলেন। দামোদর, বালকৃষ্ণ, বাসুদেব -এই তিনটি ভাই। তাঁরা চাপেকার পরিবারের তিনটি সন্তান। বিপ্লবের দলগত সম্পর্কে তাঁরা তিনটি ভাই এবং সতীর্থ। তবে এ ক্ষেত্রে রক্ত থেকেও আদর্শের টান অধিক। সেই আদর্শ হল দেশজননীর মুক্তিকল্পে জীবনের শেষ রক্তবিন্দু দান। সেই আদর্শ অব্যাহত রাখার শক্তিমূল ঐ গীতার অক্ষরগুলোর মধ্যে।

কিন্তু শুধু বিস্ময়ে বিহ্বল হয়ে থাকার ব্যক্তি যাঁরা নন, তাঁরা চাইলেন আবিষ্কার করতে- চাপেকার ভ্রাতৃবৃন্দের শক্তি-উৎস কোথায়?

এই জিজ্ঞাসুদের অন্যতমা ছিলেন ভগ্নী নিবেদিতা। মহাযোগী, মহান বিপ্লবী বিবেকানন্দের মানস কন্যা, রবীন্দ্রনাথের ‘লোকমাতা’ ছুটে গেলেন শহর পুণায় শহিদত্রয়ের শক্তি-উৎস সন্ধানে। তাঁকে যে দেখতেই হবে শৌর্যবানদের গর্ভধারিণীর রূপ! চাপেকার গৃহে লোকমাতা প্রবেশ করতেই দেখলেন এক মহিয়সী নারী পূজার আসনে উপবিষ্টা। গৃহদেবতার আরাধনায় সকল সত্তা তাঁর নিমগ্ন। পূজা-অন্তে আলাপ হল দু’জনার। অনুভব করলেন নিবেদিতা যে, এই মহিলা বিরাজ করছেন এক অখণ্ড শান্তির রাজ্যে, আপন শক্তিতে। তাঁর সর্ব শোক-তাপ, দুঃখ-বেদনা ‘নারায়ণ’র পায়ে নিবেদিত। তাঁর ভাল-মন্দ, ইহকাল-পরকাল বিশ্বনিয়ন্তার ধ্যানে সমর্পিত। নিবেদিতা স্পর্শ করলেন চাপেকার-ভাইদের শক্তি-উৎস এই মহিয়সী নারীর মধ্যে। (‘ভারতে সশস্ত্র-বিপ্লব’, পৃঃ ২৮)

যে সত্য নিবেদিতা সেদিন আবিষ্কার করেছিলেন চাপেকার-ভাইদের শক্তি-উৎস সম্পর্কে, সে সত্য মোটামুটি স্থির হয়ে আছে প্রত্যেকটি শহিদ-জীবনেরই শক্তি-উৎস রূপে। মাতৃভক্তি সে যুগের বিপ্লবীদের মধ্যে নির্ভেজাল ছিল বলেই দেশকে তাঁরা জননীরূপে গ্রহণ করতে পেরেছিলেন। সেই দেশজননীর অপমান অসহ্য হয়েছিল বলেই তাঁর দাসত্ব-শৃঙ্খল ভেঙ্গে ফেলার চেষ্টায় তাঁরা প্রাণ দিতেন।

এই প্রাণদানের শিক্ষা বড় সামান্য ছিল না। সেই শিক্ষালাভ বিপ্লবীর শুরু হয়েছিল প্রথম দিন থেকে। মন্ত্রের মত অনুপ্রাণিত করত তাঁকে-

ক্লৈব্যং মাস্ম গমঃ পার্থ নৈতৎ ত্বয্যুপপদ্যতে।
ক্ষুদ্রং হৃদয়দৌর্বল্যং ত্যক্ত্বোত্তিষ্ঠ পরন্তপ।। ২/৩

হাজার বছরের বছরের অন্ধকার জাতির জীবনে ক্লীবত্ব এনেছে। এই ক্লীবত্বকে দূর করতে হবে। হৃদয়ের ক্ষুদ্রতা, হৃদয়ের দৌর্বল্য পরিহার করে জাতির প্রতিটি অংশকে জাগ্রত হতে হবে, কর্মোদ্যোগী হতে হবে। গীতার এই বাণী প্রত্যেক বিপ্লবীর কাছেই বরণীয় ছিল। রক্তের অক্ষরে সেই বাণীকে প্রতিষ্ঠিত করার সংকল্প ছিল তাঁদের প্রত্যেকটি পদক্ষেপে। রবীন্দ্রনাথের ভাষায় তাঁদের কামনা ছিল-

আত্ম-অবিশ্বাস তার নাশ কঠিন ঘাতে,
পুঞ্জিত অবসাদভার হান অশনিপাতে।…

বিপ্লবের কর্মীকে এক একজন ‘অর্জুন’ হতে হবে, কুরুক্ষেত্রের অর্জুন। গীতার বাণী মর্ম দিয়ে উপলব্ধি না করতে পারলে সেই অর্জুন বা ‘সব্যসাচী’ হওয়া যায় না।
বিপ্লবের কর্মী শুনলেন-

নাসতো বিদ্যতে ভাবো নাভাবো বিদ্যতে সতঃ।
উভয়োরপি দৃষ্টোঅন্তস্ত্বনয়োস্তত্ত্বদর্শিভিঃ।। ২/১৬

অর্থাৎ শুনলেন তিনি পার্থসারথির কণ্ঠে- “প্রিয়বস্তুর ‘প্রাপ্তিতে’ হর্ষ অথবা ‘অভাবে’ বিষাদ, এই দু’টি বস্তুই ত্যাগ করতে হবে। অসৎ বস্তুর স্থায়িত্ব নেই। সৎ বস্তুর বিনাশ নেই। যাঁরা তত্ত্বদর্শী, তারা সদসৎ উভয় বস্তুরই স্বরূপ উপলব্ধি করেন।” সুতরাং বিপ্লবী বুঝলেন যে, তাঁকে তত্ত্বদর্শী হতে হবে। বিপ্লব-পথের পথিক শুনলেন-

অন্তবন্ত ইমে দেহা নিত্যস্যোক্তাঃ শরীরিণঃ।
অনাশিনোঅপ্রমেয়স্য তস্মাদ্ যুধ্যস্ব ভারত।। ২/১৮

পার্থকে বলছেন পার্থসারথি- ‘আত্মা যে দেহে বাস করেন সেই দেহ নশ্বর। কিন্তু আত্মা অবিনাশী ও নিত্য এবং স্বপ্রকাশিত। অতএব হে অর্জুন, যুদ্ধ কর।’ সুতরাং বিপ্লবীকেও আত্মার অবিনাশিতা ও দেহের নশ্বরত্ব স্মরণ রেখে বীরের মত স্বধর্ম অর্থাৎ ‘বিপ্লবীর ধর্ম’ পালন করতে হবে।

বলছেন গীতার ভগবান-

য এনং বেত্তি হন্তারং যশ্চৈনং মন্যতে হতম্ ।
উভৌ তৌ ন বিজানীতো নায়ং হন্তি ন হন্যতে।। ২/১৯

অথবা

ন জায়তে ম্রিয়তে বা কদাচিন্নায়ং ভূত্বা ভবিতা বা ন ভূয়ঃ।
অজো নিত্যঃ শাশ্বতোঅয়ং পুরাণো ন হন্যতে হন্যমানে শরীরে।। ২/২০

অন্তরের নিভৃতে এই বাণীকে স্পর্শ করতে চাইলেন বিপ্লবী। তিনি বুঝলেন- ‘আত্মা কাউকে হত্যা করেন না, তাঁকে কেউ নিধন করতেও পারে না। কারণ আত্মার জন্ম নেই, মৃত্যুও নেই। আত্মা সৎরূপে নিত্য বিদ্যমান। ইনি শাশ্বত।’

বিপ্লবী তাই মৃত্যুর ভয় করবেন কেন? তাঁর আত্মা তো মৃত্যুহীন। বিপ্লবী বিশ্বাস করলেন গীতার বাণী-

বাসাংসি জীর্ণানি যথা বিহায় নবানি গৃহ্নাতি নরোঅপরাণি।
তথা শরীরাণি বিহায় জীর্ণান্যন্যানি সংযাতি নবানি দেহী।। ২/২২

মহারাষ্ট্র পেরিয়ে বিপ্লব-বহ্নি এসে অভ্রংলিহ শিখায় জ্বলে উঠল বাঙলা দেশে। ১৯০২ সাল থেকে ১৯০৫ সাল পর্যন্ত প্রস্তুতিপর্ব। অরবিন্দ বিপ্লবের ঋষি, নিবেদিতা তাঁর সহায়দাত্রী। পি. মিত্র, সরলা দেবী, সতীশ বসু প্রমুখ স্বনামধন্য ব্যক্তিগণ বাঙলার তরুণদের মধ্যে শরীরচর্চা ও দুঃসাহসিকতার শিক্ষাদান করে যাচ্ছেন। অরবিন্দ বিপ্লবী-দল সংগঠনে তৎপর। তাঁর অনুগামী হলেন বারীন ঘোষ, যতীন বন্দ্যোপাধ্যায়, উল্লাসকর দত্ত, হেম কাননগো, যতীন মুখার্জি এবং আরও কত তরুণবীর।

গীতা ছিল তৎকালে মুক্তিযোদ্ধাদের প্রধান অস্ত্র। তাঁদের মধ্যে যাঁরা অনন্য – তাঁরা সত্যি সর্বসত্তা দিয়ে হৃদয়ঙ্গম করেছিলেন-

নৈনং ছিন্দতি শস্ত্রাণি নৈনং দহতি পাবকঃ।
ন চৈনং ক্লেদয়ন্ত্যাপো ন শোষয়তি মারুতঃ।। ২/২৩
অচ্ছেদ্যোঅয়মদাহ্যোঅয়মক্লেদ্যোঅশোষ্য এব চ।
অব্যক্তোঅয়মচিন্ত্যোঅয়মবিকার্যোঅয়মুচ্যতে।। ২/২৪

তাঁরা জেনেছিলেন- ‘আত্মার অবয়ব নেই। সুতরাং অস্ত্র তাঁকে ছেদন করতে পারে না, অগ্নি তাঁকে দহন করতে পারে না, জল তাঁকে ভেজাতে পারে না, বায়ু তাঁকে শুকাতে পারে না। আত্মা অচ্ছেদ্য, অদাহ্য, অক্লেদ্য, অশোষ্য। আত্মা নিত্য, সর্বব্যাপী, স্থির, অচল, সনাতন, অব্যক্ত অচিন্ত্য, অবিকার্য।’

এই সত্যকে নিত্য গীতাপাঠে শুধু নয়, নিত্যকার ক্রিয়াকলাপের মধ্য দিয়ে শ্রেষ্ঠ বিপ্লবীরা আত্মস্থ করেছিলেন বলেই সম্মুখ-যুদ্ধে বাঙলার প্রথম শহিদ প্রফুল্ল চাকি ১৯০৮ সালের মে মাসে শত্রুর জীবন নিতে যেমন শক্তিবিধৃত হয়ে উঠেছিলেন, নিজের জীবন দিতেও তেমনি ভয়মুক্তের বিভা বিকিরিত করতে পেরেছিলেন। আবার ঐ বছরই, ১১ই আগস্টের এক প্রভাতে, মজঃফরপুর জেলের ফাঁসিমঞ্চে জীবন দিলেন প্রফুল্ল চাকির সতীর্থ ক্ষুদিরাম বসু। প্রশমিত চিত্তে, অপার সৌন্দর্যে। শহিদ-তীর্থে ক্ষুদিরামের এই অভিযাত্রা সন্দর্শনেই সেইকালে ‘দি এম্পায়ার’ নামক কাগজে প্রকাশিত হল: Khudiram Bose was executed this morning,… it is alleged that he mounted the scaffold with his body erect. He was cheerful and smiling.

গীতায় ‘বিনাশায় চ দুষ্কৃতাম্’ বাক্যটি বিপ্লবীর একটি প্রতিজ্ঞা হয়ে গিয়েছিল। তাই দেখা যায় বিপ্লবীদের শাসনদণ্ড অচল থাকল না ১৯০৮ সালেও। মোকামা-ঘাটে পুলিশ সাব্-ইন্সপেকটর নন্দলাল ব্যানার্জির অতিরিক্ত উৎসাহে প্রফুল্ল চাকি পুলিশ কর্তৃক ঘেরাও হয়ে নিজের আগ্নেয়াস্ত্রের বুলেটেই আত্মদান করলেন। বিপ্লবীরা, দুষ্কর্ম যে করল তাকে ন্যায্য শাস্তি দেবেনই! প্রফুল্ল চাকির আত্ম-বিলয়নের পর মাস ছয় কেটে যেতেই ঢাকার গুপ্ত বিপ্লবী সমিতি ‘মুক্তি সংঘে’র (পরবর্তীকালের ‘বি-ভি’) কর্মনেতা শ্রীশচন্দ্র পালের হাতে প্রাণ দিতে হল নন্দলালকে কলকাতার সার্পেনটাইন লেনে, ৯ই নভেম্বরের (১৯০৮) এক সন্ধ্যায়। কেউ খুঁজে পেল না শ্রীশচন্দ্রকে। কেউ জানল না যে তাঁর সাথী ছিলেন অপর একটি তরুণ, ‘আত্মোন্নতি সমিতি’র রণেন গাঙ্গুলি।

১৯০৮ সাল থেকে ১৯১০ সালের মধ্যে ফাঁসির মঞ্চে আরোহণ করলেন কানাই দত্ত, সত্যেন বসু, চারু বসু ও বীরেন দত্তগুপ্ত। তাঁরা প্রত্যেকে মৃত্যু জয় করেন বিপ্লবীদলে কার্যভার পাবার মুহূর্তেই। তাঁদের প্রত্যেকের রক্ষাকবচ ছিল ঐ গীতার অক্ষয় বাণী। ঐ বাণীই মূর্ত হয়ে উঠেছিল তাঁদের বিপ্লবগুরু শ্রীঅরবিন্দের মধ্যে। এ সেই অরবিন্দ – যাঁর ‘বাসুদেব দর্শন’ লাভ হয়েছিল ইংরেজের কারাগারে, আলিপুর-বোমা-ষড়যন্ত্র-মামলার কালে।

স্থিতধী কানাইলাল দত্ত। তাঁর মধ্যে দেখা গেল বিস্ময়কর, প্রচণ্ড এক আত্ম-সমাহিত শক্তি। তাঁর ফাঁসির দণ্ডের বিরুদ্ধে আপিলের কথা উঠলে তিনি বলেছিলেন, “There shall be no appeal…” আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায় এই উক্তি শুনে বলেছিলেন, “কানাই শিখিয়ে গেল হে! Shall আর Will এর ব্যবহার করতে আর কেউ ভুল করবে না।” (‘বিপ্লবী জীবনের স্মৃতি’, পৃঃ ৩২৯)

আরো একটি ঘটনা। শিবনাথ শাস্ত্রীকে ব্রাহ্মসমাজের আচার্য হিসেবে ব্রাহ্মধর্মী সত্যেন বসুর সঙ্গে সাক্ষাৎ করার জন্য জেলের condemned-সেলে যাবার অনুমতি দেওয়া হয়। তিনি তাঁকে শেষ আশীর্বাদ করবেন। সাক্ষাৎকার অন্তে জেলের বাইরে চলে এলে শাস্ত্রী মহাশয়কে প্রশ্ন করা হয়েছিল যে, কানাইকেও তিনি আশীর্বাদ করে এলেন কিনা। উত্তরে তিনি বলেছিলেন, ‘সে পিঞ্জরাবদ্ধ সিংহ। বহু তপস্যা করলে তবে যদি কেউ তাকে আশীর্বাদ করার যোগ্যতা লাভ করতে পারে।’ (‘বিঃ জীঃ স্মৃঃ’, পৃঃ ৩২৯)

সত্যেন বসু। জয় করেছেন তিনি ভয়কে। তিনিও কানাই দত্তের মত গীতার বাণী হৃদয় দিয়ে গহণ করেছেন- ‘বিনাশমব্যয়স্যাস্য ন কশ্চিৎ কর্তুমর্হতি’। অর্থাৎ- এই অব্যয় স্বরূপের বিনাশ কেহই করতে পারে না। ফাঁসির মঞ্চে যাবার পূর্ব মুহূর্তে সত্যেনকে সেল্ তেকে নিয়ে এসেছিলেন যে শ্বেতাঙ্গ সার্জেন্ট, তাঁর উক্তি- “When I went to his cell to get him to the gallows, he was wide awake. When I said, ‘be ready’, he answered, `Well, I am quite ready’, and smiled. He walked steadily to the gallows. He mounted it bravely and bore it cheerfully.” (শ্রীঅরবিন্দ ও বাঙলার স্বদেশী যুগ’, পৃঃ ৭৪৮)। তাঁর সম্পর্কেই শ্বেত পুলিশ-সুপার বলেছিলেন জেল-গেটে অপেক্ষমান বিপ্লবীদেরই জনৈক বন্ধু ব্যক্তিকে- “You can go now. The thing is over. Satyendra died bravely.” এ সব ঘটনার সময়কাল ১৯০৮ সাল।

এলো ১৯০৯ সালের ১০ই ফেব্রুয়ারি। আলিপুরের সরকারী উকিল আশু বিশ্বাসকে মৃত্যুদণ্ড দান করলেন বিপ্লবী চারু বসু। চারু বসু কী বলেছিলেন? দায়রা জজের কোর্টে বলছেন বন্দী কিশোর- No sessions trial, but hang me tomorrow. It was all pre-ordained that Ashu Babu shall be shot by me, and I shall be hanged. I killed him as he was an enemy of the country. (‘Roll of Honour’, p. 206)

১৯১০ সালের ২৪শে জানুয়ারী। হাইকোর্টের সিঁড়িতে পুলিশের কর্তা সামসুল আলম নিহত হলেন বীরেন দত্তগুপ্তের গুলিতে। এই এ্যাক্শানের পাঁচ দিন পর (২৯শে জানুয়ারি) ‘কর্মযোগিন্’ কাগজে শ্রীঅরবিন্দ লিখেছিলেন- “Boldest of the many bold acts of violence. They (the revolutionaries) prefer public places and crowded buildings – Nasik-London-Calcutta. – Goswami in jail – These are remarkable features.’ ’ (‘শ্রীঃ অঃ বাঃ স্বঃ যুঃ’, পৃঃ ৮১৬)

দুঃসাহসের এই বাণী কোথায় পেয়েছিলেন অরবিন্দ? কোথায় পেয়েছিলেন তাঁর বিপ্লবী-অনুগামীর দল এবং সর্বভারতের সকল বিপ্লবী? মৃত্যুহীন সত্তায়, ফলাফলের মোহ হতে মুক্ত থেকে, কর্তব্যপালনে আত্মনিবেদনের যে নিষ্ঠা – তার উৎস তাঁরা খুঁজে পেয়েছিলেন কোথায়? অরবিন্দ থেকে সেই যুগের প্রত্যেকটি বিপ্লবীই এর উত্তরে ‘গীতা’র নামোচ্চারণ করবেন। গীতার শ্লোকগুলো বিপ্লবীদের ছিল মর্মবাণী, রক্তের সম্পদ।

১৯০৮ সাল থেকে পর পর নাসিকের প্রেক্ষাগৃহে জ্যাক্সন হত্যা, লন্ডনের সভাকক্ষে কার্জন উইলি নিধন, কলকাতার জেলের অভ্যন্তরে বিশ্বাসঘাতক নরেন গোঁসাইকে মৃত্যুদণ্ড দান করেছিলেন যাঁরা, তাঁদের কার্য সম্বন্ধে শ্রীঅরবিন্দ বললেন- ‘These are remarkable features’; আর এসব কর্মীর সম্পর্কেই গীতার উক্তি- ‘বুদ্ধিযুক্তাঃ মনীষিণঃ জন্মবন্ধবিনির্মুক্তাঃ পদং গচ্ছন্ত্যনাময়ম্।’ বিপ্লবীদের কাছে তাই গীতা ধর্মগ্রন্থ ছিল না – ছিল মর্মগ্রন্থ, ছিল প্রতিদিবসের মননশীলতায় প্রাপ্ত অমূল্য আভরণ। রণসাজে সজ্জিত হবার বিশিষ্ট আভরণ।

এ-ও একটি জানা কথা যে, নিজে পড়বার সময় না করতে পারলে বিপ্লবী মহানায়ক যতীন্দ্রনাথ অপরের কণ্ঠে গীতাপাঠ শুনতেন। তাই আমরা দেখি- তাঁর মাউজার-পিস্তল বাজাতে পেরেছিল ‘পাঞ্চজন্যে’র রণ-ধ্বনি। ১৯১৫ সালের বালেশ্বর-যুদ্ধ তাঁর কাছে কুরুক্ষেত্র-যুদ্ধেরই একটি সংক্ষিপ্ত রূপ নিয়ে এসেছিল। তাঁরা পাঁচটি বীর তাই লড়তে পেরেছিলেন রাইফেলধারী দুর্ধর্ষ ইংরেজের সৈন্যবাহিনীর সঙ্গে। মৃত্যুকে বরণ করতে তাঁরা দ্বিধা করেন নি। কারণ তাঁরা জানতেন- ‘জাতস্য হি ধ্রুবো মৃত্যুর্ধ্রুবং জন্ম মৃতস্য চ’। তাঁরা জানতেন-

যদৃচ্ছয়া চোপপন্নং স্বর্গদ্বারমপাবৃতম্।
সুখিনঃ ক্ষত্রিয়াঃ পার্থ লভন্তে যুদ্ধমীদৃশম্।। ২/৩২

অর্থাৎ, এ যুদ্ধ মুক্ত স্বর্গদ্বার স্বরূপ। ভাগ্যবান ক্ষত্রিয়ের জন্যই এমন যুদ্ধলাভ সম্ভব। বিপ্লবীর বিশ্বাস, এমন প্রবুদ্ধ-ক্ষাত্রশক্তির উদ্দেশ্যেই হয়ত রবীন্দ্রনাথ আহ্বান জানিয়েছেন-

আকাশে ধ্বনিছে বারম্বার,
‘মুখ তোলো,
আবরণ খোলো,
হে বিজয়ী, হে নির্ভীক,
হে মহাপথিক,
তোমার চরণক্ষেপ পথে পথে দিকে দিকে
মুক্তির সংকেতচিহ্ন
যাক্ লিখে লিখে।’

গীতার প্রভাবে প্রবুদ্ধ অপর একটি বিপ্লবী-নায়কের কথা মনে পড়ে। দীর্ঘ তিরিশটি বছর সেই ব্যক্তি জেলে জেলে সকল দুঃখ ও গ্লানি, জেলকোডের সবগুলো সাজা ভোগ করেছিলেন প্রশান্তচিত্তে – মধুর হাসি হেসে। দেশ স্বাধীন হবার পরও সেই ব্যক্তির বেশ কিছুকাল কেটেছে পাকিস্তানের কারাকক্ষে। অশীতি বৎসর পেরিয়ে রোগজীর্ণ দেহে এইতো সেদিন এলেন তিনি ভারতখণ্ডে। মৃত্যু হল কর্মরত অবস্থায়ই তাঁর, রাজধানী দিল্লী শহরে সতীর্থদের স্নেহাশ্রয়ে। এই ব্যক্তির বিপ্লবী নাম ‘মহারাজ’। পোষাকী নাম ত্রৈলোক্যনাথ চক্রবর্তী। অদ্ভূত এক কর্মযোগী। কর্মযোগের মাধ্যমেই ঘটল তাঁর কর্মনিবৃত্তি। লাভ করলেন তিনি নির্বাণ। ১৯৭০ সালের ৯ই আগষ্ট সহস্র সহস্র মানুষ প্রত্যক্ষ করেছিল সেই নির্বাণ-প্রাপ্ত বিপ্লবী নায়কের শবযাত্রা দিল্লীর পথে। এই যে মহারাজ – তাঁর জীবনের সর্বোত্তম অবলম্বন ছিল ‘গীতা’। গীতা ছিল তাঁর রক্ষাকবচ। তিনি গীতাভাষ্য রচনায় নিযুক্ত থাকতেন সেই আনন্দে, যে-আনন্দে মানুষ গুন্গুনিয়ে গান গায়।…

বিপ্লবী যুদ্ধ করেছেন – আঘাত হেনেছেন, আঘাত খেয়েছেন। ফাঁসীর মঞ্চে বা গুলিবিদ্ধ হয়ে মৃত্যুবরণ করে বহু বিপ্লবী ‘শহিদ’ হয়েছেন। কিন্তু ১৯২৯ সালে দেখি নূতন এক পটভূমির বুকে নূতন এক দৃশ্য। এমন দৃশ্য ভারতবর্ষের রাষ্ট্রজীবনে কেউ দেখে নি।…

বাঙলার বিপ্লবী-তরুণ যতীন দাস। পাঞ্জাবের জেলে আমৃত্যু অনশনের প্রতিজ্ঞায় তিনি অচঞ্চল। সারা ভারতবর্ষ শঙ্কায় ও বিস্ময়ে তাকিয়ে আছে আদর্শনিমগ্ন তাপসের দিকে। এ-প্রসঙ্গে ‘সবার অলক্ষ্যে’ গ্রন্থে পাই- ‘ভারতের টেরেন্স ম্যাক্সুইনি জেল-বন্দীদের প্রতি ‘মানুষের ব্যবহার’ দাবি করে তেষট্টি দিন নিরম্বু উপবাস করেন লাহোর সেন্ট্রাল জেলে। এই অনশনে তাঁর মৃত্যু ঘটে। দেহত্যাগের তারিখ ১৩ই সেপ্টেম্বর। এ-মৃত্যু তো সাধারণ ‘অনাহারে মৃত্যু’ নয়। এ-যে চিরঞ্জীবী হওয়ার দুর্জয় তপস্যা। এ-তপস্যায় প্রতি মুহূর্তে মৃত্যুকে জয় করেছেন তিনি তিলে তিলে জীবন দিয়ে। দান সম্পূর্ণ করে তিনি হলেন জীবিতেশ্বর।’ (‘সবার অলক্ষ্যে’, ১ম পর্ব, পৃঃ ৩৪)

যতীন দাসের তিলে তিলে এই আত্মদানের উৎস কোথায়? উৎস ঐ আপ্তবাণীর মধ্যে- “সুখদুঃখে সমে কৃত্বা লাভালাভৌ জয়াজয়ৌ।” অর্থাৎ সুখ-দুঃখ, লাভ-অলাভ, জয়-পরাজয় তুল্যজ্ঞান করে এই যুদ্ধে তিনি উদ্বুদ্ধ হয়েছিলেন। কাজেই তাঁর কাছে অন্নগ্রহণ বা অন্নত্যাগের মধ্যে কোন পার্থক্য ছিল না। আদর্শের জন্য তিনি নিষ্কাম-চিত্তে এগিয়ে গেলেন। মৃত্যু এলো। জীর্ণ বস্ত্রখণ্ডের মত দেহ ত্যাগ করলেন তিনি। কিন্তু তাঁর আদর্শ মৃত্যুহীন হয়ে রইল।

তথ্যঋণ :
১) ফাঁসির মঞ্চে গেয়ে গেলো যাঁরা – চিন্ময় চৌধুরী
২) সংসদ বাঙালি চরিতাভিধান, প্রথম খণ্ড – সুবোধ সেনগুপ্ত ও অঞ্জলি বসু সম্পাদিত
৩) জেলে ত্রিশ বছর – ত্রৈলোক্যনাথ চক্রবর্তী
৪) ভারতের সশস্ত্র বিপ্লব – ভূপেন্দ্রকিশোর রক্ষিতরায়
৫) বিপ্লবী জীবনের স্মৃতি – যাদুগোপাল মুখোপাধ্যায়
৬) শ্রীঅরবিন্দ ও বাঙলার স্বদেশী যুগ – গিরিজা রায় চৌধুরী
৭) সবার অলক্ষ্যে – ভুপেন্দ্রকিশোর রক্ষিত রায়
৮) এইবেলা আর্কাইভস

1 Comment

  1. খুব ভাল লাগল। আমার জানার ইচ্ছা ছিল এইরকম একটা বিষয় ।

    Like

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s