বাঙালিত্ব আর বেকারত্ব

স্মৃতিলেখা চক্রবর্তী

কলকাতার বাজার-হাটে ঘুরলে কিছু অদ্ভুত মানুষের সাথে দেখা হয়ে যায়। একদল সুস্থ স্বাভাবিক জোয়ান ছেলে বিনা কারণে, এমনি এমনি পথে পথে ঘুরে বেড়াচ্ছে। কেউ পার্কে বসে থাকে সারাদিন, কেউ বাজার ঘোরে, দোকানদারের সাথে গল্প করে। এদের মুখে একটা অন্যরকম অস্থির ভাব আছে, অভ্যস্ত চোখ দেখলেই চিনতে পারে। একবার এমনই এক অস্থির মানুষের কিছু কথা কানে এসেছিল। ছেলেটি সকাল সকাল বাড়ি থেকে বেরোয়, সারাদিন পথে পথে ঘোরে। আত্মীয়দের সাথে কথা বলে না, কোন সামাজিক অনুষ্ঠানে যায় না, বন্ধুদের সাথেও সম্পর্ক রাখে না। কথা বলতে গেলেই চাকরির প্রসঙ্গ উঠবে। ছেলেটি সম্পুর্ন বেকার। চাকরি পাবার খুব যে আশা আছে, এমনটা সে মনে করে না। তাই পরিবার-পরিজন, আত্মীয়-স্বজন সকলকে সে সারাদিন এড়িয়ে থাকতে চায়, যতদিন পারে।
খবরে আজকাল প্রায়ই পড়ি চাকরিপ্রার্থীদের SSC আন্দোলনের কথা। নিয়োগ দুর্নীতি, রাজনীতি ইত্যাদি নিয়ে কুতর্ক করব না। কিন্তু অনশন করে চাকরি পাওয়ার চেষ্টা, শুনলে আমার বিন্দুমাত্র মায়া বা করুণা হয় না। বরং হাসি পায়। চাকরির জন্য কতটা বুভুক্ষু হলে একটা রাজ্যের জোয়ান ছেলেমেয়েরা  29 দিন না খেয়ে সরকারি চাকরি চাইতে পারে। তর্কের খাতিরে যদি ভবিষ্যতে চাকরিটা হয়েও যায়, তবে সেটা প্রার্থীদের শিক্ষাগত যোগ্যতার জন্য নয়, না খেয়ে থাকতে পারার যোগ্যতার জন্য হবে। রাজ্যে একের পর এক বাংলা স্কুল বন্ধ হচ্ছে, আর বাঙালি SSC প্রার্থীরা আরো বেশি বেশি করে বাংলা স্কুলে চাকরি চাইছে। এরা হয়তো বুঝতে পারছেন না, এখন শুধু সরকারি স্কুল বন্ধ হচ্ছে। এরপর বন্ধ হতে শুরু করবে সরকারি কলেজ। শিক্ষার বেসরকারিকরণ কি জিনিস, সরকারি চাকরি প্রার্থী আর ডিগ্রিপ্রিয় বাঙালিকে হাড়ে হাড়ে বুঝিয়ে ছাড়বে।
পশ্চিমবঙ্গে শিক্ষিত মধ্যবিত্ত শ্রেণীর মধ্যে একটা অদ্ভুত ধারণা প্রচলিত আছে- “আমাকে চাকরি দেবার দায় সরকারের”। সরকারি চাকরি না পেলে বেকার থাকা ভাল। কে বোঝাবে এদের, সরকারের কাজ লোককে চাকরি দেওয়া নয়, সরকারটা ভালোভাবে চালানো। সরকার ততটুকুই লোক নেবে, যতটুকু সরকার চালাতে প্রয়োজন। দরকার না থাকলেও শুধুমাত্র বেকারদের চাকরি দিতে সরকারি নিয়োগ চালু রাখতে হবে, এ তো ভারী অন্যায় আবদার। আরেকটা মজার ব্যাপার হল, মধ্যবিত্ত বাঙালি যুবসমাজের একটা বিরাট অংশ বেসরকারি চাকরিকে “অসম্মানজনক” বলে মনে করেন। শুধু তাই নয় বেসরকারি বহু কাজ এবং তাদের কর্মীদের এরা নীচু চোখে দেখে। এতটাই নিচু চোখে যে 5 বছর যাবৎ বেকার বসে থাকা ছেলেমেয়েরাও এইসব ক্ষেত্রে কাজ করতে বিন্দুমাত্র ইচ্ছুক নয়। এদের অপছন্দের তালিকা এবং অভিযোগের ফিরিস্তিটা বেশ বড়। কল সেন্টার, হোটেল ইন্ডাস্ট্রি নিয়ে এদের অভিযোগ হল- “রাত্রে রাত্রে কাজ” এবং “ছুটি নেই”! বিক্রি করার কাজ বা বিমার দালালি নিয়ে এদের অভিযোগ হল- “খুব চাপ” এবং “এসব চাকরি আজ আছে, কাল নেই”। আমি মনে করি, বাঙালির আসল রোগ হল মজ্জায় মজ্জায় ঢুকে থাকা আরামপ্রিয়তা, খাটতে ভয় পাওয়া এবং আলসেমি। বেকারত্ব তো স্রেফ রোগের একটা লক্ষণ মাত্র।
সরকারি চাকরির প্রতি বাঙালির যেটা আছে সেটা হল মোহ। কোন সৎ প্রচেষ্টাও নয়। সরকারি চাকরিতে সফল বাঙালিদের ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যাবে, এরাই কলেজে বড় বড় নামজাদা কোর্স নেয়, মাইক্রোবায়োলজি, ইঞ্জিনিয়ারিং। এবং শেষমেশ এমন সরকারি চাকরিতে ঢোকে যেখানে যে কোন বিষয়ে পাতি গ্র্যাজুয়েট হলেই চলত। দামি দামি সিটগুলোর কি অনর্থক অপচয়। IT নিয়ে ইঞ্জিনিয়ারিং পাস অথচ বেসরকারি চাকরিতে ভয়। কারণটা আর কিছুই না, খাটুনিতে প্রবল অনীহা। এরা যখন গ্র্যাজুয়েট যোগ্যতার সরকারি চাকরিতে ঢোকে, ইঞ্জিনিয়ারের একটা সিট নষ্ট করেই ঢোকে। এই ইঞ্জিনিয়ারিং সিটটা অন্য কারও হতেই পারত যে সত্যিই ইঞ্জিনিয়ার থাকতে চায়।
পাশের রাজ্য বিহারে সরকারি চাকরি প্রত্যাশীরা মোটামুটি মাধ্যমিকের আগে থেকেই নিজেদের লক্ষ্য ঠিক করে নেয়। 12 ক্লাস পেরোনোর আগেই টুকটাক সরকারি পরীক্ষার প্রস্তুতি নিতে শুরু করে। কলেজে গ্র্যাজুয়েশন নেয় এমন বিষয়ে যাতে পাস করা সহজ। সেক্ষেত্রে চাকরির পরীক্ষা দেওয়ায় বাড়তি মনোযোগ দেওয়া যেতে পারে। ডিগ্রি তো উপলক্ষ্য, আসল লক্ষ্য তো চাকরি। গ্র্যাজুয়েশন পাশের পরও চাকরি না পেলে বিহারীরা অনর্থক টাইমপাস করে না পোস্ট গ্র্যাজুয়েট, ডবল পোস্ট গ্র্যাজিয়েশন ইত্যাদি করে। পুরো মনপ্রাণ লাগিয়ে দেয় সরকারি চাকরির পরীক্ষায়। এই সিস্টেমেটিক পড়াশুনার ফল কেন্দ্র সরকারি চাকরিতে গাদাগাদা বিহারের ছেলেমেয়ে ঢোকা। সবটাই হিন্দিতে উত্তর লিখতে পারার অবদান নয়।
এর সাথে বাঙালির কোন তুলনা হয়? সরকারি চাকুরী প্রত্যাশী বাঙালি প্রথমে 12 ক্লাস পাস করে, তারপর গ্র্যাজুয়েশন, তারপর পোস্ট গ্র্যাজুয়েশন, চাইলে এমফিল কি পিএইচডি-তেও ভর্তি হয়ে যায়। মানে কিছু একটা করছি দেখিয়ে যতদিন বসে থাকা যায় আর কি। গ্র্যাজুয়েশন কি পোস্ট গ্র্যাজুয়েশন পাস করার পর, হঠাৎ একদিন বাঙালি ছেলেমেয়েদের বোধোদয় হয় যে এবার সরকারি চাকরির পরীক্ষাগুলো দেওয়া দরকার। ততদিনে বয়স সরকারি পরীক্ষা দেবার সর্বোচ্চ সীমার কাছাকাছি পৌঁছে গেছে।
 এই দুনিয়ার নিয়ম হল, যে মানুষ যত বড়, তার গর্ব তত বড়। বাঙালিদের ক্ষেত্রে ব্যাপারটা ঠিক উল্টো। যে মানুষ যত হেরো, সে নিজেকে তত বড় হিরো ভাবে। এক 28 বর্ষীয় বেকার একবার হোটেল ইন্ডাস্ট্রির এক সফল কর্মীকে দেখিয়ে আমাকে বলেছিল- “করে তো ওই হোটেলের চাকরি, আসলে তো পাতি গ্র্যাজুয়েট। আমি কিন্তু ডবল পোস্ট গ্র্যাজুয়েট।” মানেটা খুব স্পষ্ট। তোমার চাকরি থাকলে আমারও ডিগ্রি আছে। এই ডিগ্রিপ্রিয় বাঙালি চাকরি না থাকার দুঃখ দিব্যি ভুলে যায় একের পর এক ডিগ্রি দখল করে।
বেকার কথাটার বেশ কয়েক রকম অর্থ হয়। ভারতে যার রোজগার একেবারে শূন্য, তাকেই বেকার বলা হয়। উন্নত দেশগুলোয় রোজগেরে লোকদেরও বেকার বলা হয়, যদি সে নিজের জীবনধারণের প্রয়োজনীয় অর্থ রোজগার না করতে পারে। আমি এদের আধ-বেকার বলি। বাংলার শিক্ষিত বেকাররা যদি শিক্ষার গর্বে উদ্ধত হয়, এই আধ-বেকাররা তাহলে বেকারির সুপার-স্পেশালিস্ট। নানারকম কন্ট্রাক্টে এরা চাকরি করে এবং বেশি মাইনের সুযোগ থাকলেও নিজের ডিগ্রির বিষয় ছাড়া অন্য কিছুতে চাকরি করতে চায় না। শিক্ষাদ্ধত বেকার আর সুপার-স্পেশালিস্ট আধ-বেকাররা শিক্ষিত বাঙালি যুব-সমাজের একটা বিরাট অংশ। এই অনড়, গোঁয়ার অবস্থান এবং ভ্রান্ত শ্রেণী-গৌরব প্রায়ই এদের এতদূর অবসাদগ্রস্ত করে দেয় যে আত্মহত্যার মত দুঃখজনক জায়গায় চলে যায়। সম্পন্ন চাষীর ছেলে হঠাৎ কলেজ পাস করে মনে করল, এখন তার শ্রেণী পাল্টে গেছে। কলেজ পাস দিয়ে হাল ধরব? তার চাইতে আত্মহত্যা ভাল। বাবা কোটিপতি প্রমোটার কিন্তু ছেলেকে ব্যবসায় বসাবেন না। প্রমোটারির অনেক বদনাম, তার থেকে চাকরি করুক, ভদ্রলোক হোক। টাকা কম পেলেও বাঙালি সমাজে ভদ্দরলোকের সম্মান “ধান্দাবাজ ব্যবসায়ী”র থেকে বেশি। বাঙালির কাছে কাজের থেকেও বেশি গুরুত্বপূর্ণ হল কাজের জাতিভেদ। উঁচু কাজ, নীচু কাজে ভেদাভেদ করতে না শিখলে কি আর বাঙালি ভদ্রলোক হওয়া যায়?
মহামতি গোখেল বাংলার সাথে বাকি ভারতের তুলনা করে বলেছিলেন, বাংলা যা আজ ভাবে, বাকি ভারত ভাবে কাল। আমি বাঙালির সাথে অবাঙালীদের তুলনা করে দেখেছি- সারা ভারত যা ভাবে, যা করে, বাঙালি ভাবে এবং করে ঠিক তার উল্টো। পৃথিবীর সর্বত্রই মানুষ সরস্বতীর সাধনা করে লক্ষ্মীলাভের জন্য। বাঙালির যে কারণে সরস্বতী সাধনা, তাকে “অকর্মার সরস্বতী” বললেও খুব একটা অত্যুক্তি হয় না। কারণ কর্মজগতে প্রবেশকে যতদিন এড়িয়ে থাকা যায়, সেই লক্ষ্যেই একের পর এক ডিগ্রি লাভের নিরলস প্রচেষ্টা করে যায় একদল বাঙালি। এইসব ডিগ্রির লক্ষ্য কি, লাভ কি- এগুলো অবাঞ্ছিত অবান্তর প্রশ্ন।
চাকরিতে আলসেমি, ব্যবসায় অনীহা- বাঙালি যুবসমাজ সম্পুর্ন পচে গেছে। তার শুধু সুখ চাই, সুখ পাবার আগের ধাপগুলো সে আর কষ্ট করে পেরুতে চায় না। বাংলার শিক্ষিত যুবসমাজের কোন দিশা নেই, কোন লক্ষ্য নেই। কেমন একটা বাঁধনছেড়া, পাগলপারা ভাব। এগুলো দেখে ছোটবেলায় পড়া একটা লাইন খুব মনে পড়ে যায়। সবল মানুষ সুসময় আনে, সুসময় আনে দুর্বল মানুষ, দুর্বল মানুষ দুঃসময় আনে, দুঃসময় আনে সবল মানুষ।
 বাঙালি মধ্যবিত্ত যুবসমাজ বড়ই সুখে মানুষ, মুখ গুঁজে পড়াশোনা ছাড়া একটু দায়িত্বও নিতে হয়নি কখনো।  মাথা গোঁজার জন্য পৈতৃক বাড়ি আছে। খরচাপাতির জন্য বাবার পেনশন আছে, দায়-দায়িত্ব কম। নিজের জন্য কোনরকমে একটা কুড়িহাজারী চাকরি, নিশ্চিন্ত জীবন। এই পচা-গলা রুগ্ন বাঙালিত্বই জাতির বর্তমান। বাঙালি এখনো নিজের চারদিকে ঘনিয়ে আসা দুঃসময়টাকে পুরোপুরি আঁচ করে উঠতে পারেনি। তাই নিজের জাতিগত বদভ্যাসগুলোর একটাকেও ত্যাগ করতে পারেনি। আমি বিশ্বাস করি এটাই শেষ নয়, খুব শিগগিরই আরো বড় দুঃসময় আসতে চলেছে বাঙালির। এমন এক দুঃসময় যেটা কেটে ছেটে নির্মূল করে দেবে জাতির দুর্বল মানুষগুলোকে। বেঁচে থাকবে কেবল সবল মানুষগুলো। সবল মানুষগুলোই বয়ে আনবে জাতির সুসময়। পচা-গলা বাঙালিত্ব ধ্বংস না হলে আর সৃষ্টি হবার নয়।

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s