হিন্দু সংস্কৃতি কি ব্রাহ্মণ্যবাদী ?

আজকাল খুব একটা কথার প্রচলন হয়েছে – “দলিত সমাজ” অত্যাচারিত, ব্রাহ্মণ্যবাদীদের দ্বারা অত্যাচারিত ! এবং এই অত্যাচারের ফলেই নাকি বহু নিম্ন বর্ণের হিন্দু ধর্মান্তরিত হয়েছেন – বলা ভালো মুসলিম হয়েছেন, খ্রিস্টান হয়েছেন – সেই বহুকাল আগে থেকে ! হিন্দু সমাজ বা হিন্দু সংস্কৃতি – নাকি ব্রাহ্মণ্যবাদী !!

একটু আদিকাল থেকে দেখে আসা যাক :-
শ্রুতি থেকে বেদ যখন লিপিবদ্ধ হয় – যিনি লিপিবদ্ধ করেন – সেই ব্যাসদেব, তিনি ব্রাহ্মণ ছিলেন না ! ব্রাহ্মণ যখন পৈতা ধারন করেন – তাঁকে যে “গায়ত্রী” মন্ত্র জপ্ করতে হয় বা পাঠ করতে হয় – [“ওঁ ভূর্ভুবঃ স্বঃ
তৎ সবিতুর্বরেণ্যং
ভর্গো দেবস্য ধীমহি
ধিয়ো য়ো নঃ প্রচোদয়াৎ।”] , সেই গায়ত্রী মন্ত্রের যিনি দ্রষ্টা – মহর্ষি বিশ্বামিত্র – তিনি ব্রাহ্মণ ছিলেন না ! দেবতারা যাঁর সাহায্যে – স্বর্গ পুনর্দ্ধার করেন এবং যাঁর আত্মত্যাগ জগৎ স্বরণীয়, সেই দধিচি মুনি – শূদ্র ছিলেন – ব্রাহ্মণ ছিলেন না ! যাঁকে দক্ষিণ ভারতের উদ্ধারকর্তা বলা হয় – সেই অগস্ত্যা মুনি – শূদ্র ছিলেন, ব্রাহ্মণ ছিলেন না ! এরপরেও হিন্দু সংস্কৃতি ব্রাহ্মণ্যবাদী ?

ত্রেতা যুগে রচিত রামায়ণ – যিনি রচনা করলেন – মহাঋষি বাল্মীকি, ব্রাহ্মণ ছিলেন না(আজও দেখুন – উত্তর প্রদেশের বাল্মীকি যাঁরা, তাঁরা এস.সি.)! রামায়ণে সব থেকে শ্রদ্ধেয় চরিত্র – রাম, ক্ষত্রিয় ছিলেন – ব্রাহ্মণ নয় ! শ্রীরামের যুদ্ধ যাঁর বিরূদ্ধে – তিনি রাবণ, রাবণ ব্রাহ্মণ ছিলেন ! এরপরেও হিন্দু সংস্কৃতি – ব্রাহ্মণ্যবাদী ?

মহাভারতে তিন নীতির যুদ্ধ ! ধর্মনীতি, রাজনীতি এবং কূটনীতি ! ধর্মনীতি যিনি ধারন করে আছেন তিনি শ্রীকৃষ্ণ ! রাজনীতি যিনি ধারন করে আছেন – তিনি মহামতি বিদুর ! আর কূটনীতির ধারক – শকুনি ! ভারতীয় সভ্যতার প্রথম পূর্ণাঙ্গ প্রধানমন্ত্রী যাঁকে বলা হয় – সেই মহামতি বিদুর – ব্রাহ্মণ ছিলেন না ! মহাভারত যুগে শ্রীকৃষ্ণের পর যিনি সব থেকে জ্ঞানী ব্যক্তি – সেই মহামতি বিদুর শূদ্র ছিলেন – ব্রাহ্মণ ছিলেন না ! এরপরেও হিন্দু সংস্কৃতি ব্রাহ্মণ্যবাদী ?

প্রাচীন ভারতের সর্বশ্রেষ্ঠ তিন রাজবংশ – নন্দ বংশ (শূদ্র), মৌর্যবংশ(শূদ্র) এবং গুপ্ত বংশ(বৈশ্য) ! এঁরা কেউ ব্রাহ্মণ ছিলেন না ! এরপরেও যাঁদের রাজত্বের বিস্তৃতি, প্রায় মোগলদের রাজত্বের সমান বিস্তৃতি ছিলো – সেই পালবংশও ব্রাহ্মণ ছিলো না ! এমন কি সেন বংশও ব্রাহ্মণ ছিলো না ! তাহলে কখন ব্রাহ্মণ্যবাদীরা অব্রাহ্মণদের উপর অত্যাচার করেছিলো বলতে পারেন ? যখন প্রাচীন সব গল্পই দেখা যায়, দরিদ্র ব্রাহ্মণ – ভিক্ষার ঝুলি নিয়ে প্রতিদিন ভিক্ষা করতে বের হচ্ছেন, ঘরে ব্রাহ্মণপত্নী পথ চেয়ে আছেন – কখন ব্রাহ্মণ ফিরবেন, ভিক্ষা নিয়ে – তারপর রান্না হবে – সেই ব্রাহ্মণগণ অত্যাচারী ছিলো ?

আধুনিক যুগের ভারতের দিকপুরুষ – যিনি ব্রাহ্মণশ্রেষ্ঠ শ্রী রামকৃষ্ণের শিষ্য এবং যিনি রামকৃষ্ণ মঠ প্রতিষ্ঠা করেন, সেই স্বামী বিবেকানন্দ ব্রাহ্মণ ছিলেন না ! ভারত সেবাশ্রম সংঘের প্রতিষ্ঠাতা প্রণবানন্দ মহারাজ – ব্রাহ্মণ ছিলেন না ! আজ সারা বিশ্বে শ্রীকৃষ্ণ নাম মাহাত্ম্য বিতরণ, মন্দির প্রতিষ্ঠা হচ্ছে- যেই সংঘঠনের মাধ্যেমে – সেই “ইসকন” এর প্রতিষ্ঠাতা শ্রীল প্রভুপাদ – ব্রাহ্মণ ছিলেন না ! তাহলে বলতে পারেন – কোথায় এই সংস্কৃতি ব্রাহ্মণ্যবাদী ????

হ্যাঁ এঁরা সকলেই – নিজ কর্ম গুনে ব্রাহ্মণ শ্রেষ্ঠ, এবং কর্ম দ্বারাই ব্রাহ্মণ ! গীতায় শ্রীকৃষ্ণ বলেছেন – “চাতুর্বণ্যং ময়া সৃষ্টং গুণকর্মবিভাগশঃ”। তিনি গুণ ও কর্মের ভিত্তিতে চারিবর্ণের সৃষ্টি করেছেন ! চারজাতি নয় !

আমাদের সংস্কৃতি কখনো কারও মাঝে বিভেদ রাখেনি ! নাহ্ – ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য, শূদ্র – কারো মাঝে না ! ব্রাহ্মণশ্রেষ্ঠ শংকরাচার্য যেমন – মেথর কে পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করতে পিছপা হননি, তেমননি – আমাদের সংস্কৃতি – পিছপা হয়নি শূদ্র থেকে ব্রাহ্মণকে সন্মান জানাতে ! আমাদের সংস্কৃতি – ব্রাহ্মণ শ্রেষ্ঠ শংকরাচার্য, রামকৃষ্ণ দেব, চৈতন্য মহাপ্রভু, সবাই কে সন্মান দিয়েছে – তাঁদের কৃতকর্মের জন্য !

তবে কি – সেই সমাজে বা এই সমাজে বিভেদ ছিলো না – অত্যাচার ছিলো না ? অবশ্যই ছিলো – সেটা ধনী দরিদ্রের বিভেদ, দরিদ্রের উপর ধনীর অত্যাচার ! তাহলে – কেনোই বলা হয় – উচ্চজাতির প্রতি নিম্নজাতির অত্যাচার ছিলো ? কারণ – হাজার বছর পূর্বে সৃষ্টি হওয়া একটি চক্রান্ত যা আড়াইশত বছর পূর্বে আরও জোরদার হয় এবং এই হিন্দু সমাজ কে ভেঙ্গে দেওয়ার জন্য যা – আজও সমান তালে চলছে ! না হলে বলুন তো প্রায় দূ’কোটি “মতুয়া” সম্প্রদায় কেনো ইসলামিক পূর্ব-পাকিস্থান বা ইসলাম প্রধান বাংলাদেশ থেকে পালিয়ে এসে – ভারতে আশ্রয় নিতে হয় ? যদি- উচ্চবর্ণের অত্যাচারে নিম্নবর্ণের হিন্দুরা মুসলিম হয়ে থাকে ? আজও কেনো বাংলাদেশ থেকে পালিয়ে আসতে হয় –  প্রধানতঃ নিম্নবর্ণের হিন্দুদের ! বাংলাদেশ সংলগ্ন বর্ডার সাইট গুলি লক্ষ্য করুন – দেখবেন, বেশীর ভাগই তথাকথিত নিম্নবর্ণের হিন্দু ! কেনো – তাঁরা আজও মুসলিম নয় ? কারণ – যা আমাদের ইতিহাস পাল্টে গুলে খাওয়ানো হচ্ছে – তা ভুল ইতিহাস ! উল্লেখ করা যেতে পারে – পূর্ব পাকিস্থানের মন্ত্রী – যোগেন্দ্রনাথ মণ্ডলের কথা ! “দলিত-মুসলিম ঐক্য” স্লোগানের মহান প্রাণ পুরুষ – পাকিস্তান রাষ্ট্রের আইন মন্ত্রী হয়েছিলেন, কিন্তু হায় – তাঁকেও রাতের অন্ধকারে পালিয়ে আসতে হয়েছিলো হিন্দু অধ্যুষিত ভারতেই, তিনি ক্ষমা পাননি – নিম্ন বর্ণের হিন্দু হলেও !

কোন সমাজ – ব্রাহ্মণ্যবাদী ছিলো ? কিভাবে ছিলো ? যেখানে হিন্দুদের সাতটি গোত্রই চতুর্বর্ণে দেখা যায় ! যেমন – ভরদ্বাজ গোত্র, ব্রাক্ষণের যেমন আছে তেমনি শূদ্রদেরও আছে ! কাশ্যপ গোত্র – ব্রাক্ষণ থেকে শূদ্র সবার মধ্যে আছে ! এতেই কি প্রমাণ হয় না – হিন্দুরা সাম্য ? হ্যাঁ হিন্দুরা অবশ্যই সাম্যবাদী I কারন এই সংস্কৃতিই জগতের সকলের মঙ্গলার্থে এবং কোন ভেদ না করে – স্বগর্বে ঘোষনা করতে পারে – “ওম্ সর্বে ভবন্তু সুখিনঃ সর্বে সন্তু নিরাময়াঃ, সর্বে ভদ্রাণি পশ্যন্তু, মা কশ্চিতদুখভাগভবেত। ওম্ শান্তি শান্তি শান্তি।”

প্রাচীন তিনটি উচ্চশিক্ষা কেন্দ্র, তক্ষশিলা – নালন্দা – কাশী তে দেখুন তো ক’জন ব্রাহ্মণ পণ্ডিত ছিলেন আর ক’জন অব্রাহ্মণ পণ্ডিত ! তারপরেও এই সংস্কৃতি নাকি – ব্রাহ্মণ্যবাদী সংস্কৃতি ????

সর্বশেষ উদাহরণ :- দলিত সম্প্রদায়ের – রামজি মালোজী শাকপাল ও ভীমারাই’র চৌদ্দতম তথা কনিষ্ঠ পুত্র ভীমরাও কে যিনি পুত্ররূপে “ভীমরাও অাম্বেদকর” নামে সারা পৃথিবী কে চিনিয়েছেন – তিনি ব্রাহ্মণ সম্প্রদায়ের “মহাদেব আম্বেদকর” (লক্ষ্য রাখুন – আম্বেদকর পদবীটি মারাঠি ব্রাহ্মণ পদবী) এবং যিনি – বাবাসাহেব ডঃ ভীমরাও রামজী আম্বেদকর কে উচ্চশিক্ষার জন্য বিদেশে পাঠিয়েছিলেন – তিনি বরদা’র মহারাজা – শাহজী রাও একজন ব্রাহ্মণ !

হিন্দু সংস্কৃতি কে ভাঙতে যাঁরা তখন থেকে এখন একই ভাবে চক্রান্ত করে গেছেন – তাদের কে উপযুক্ত জবাব দেওয়ার সময় এখনই ! কারণ আপনিও আপনার কর্মগুনে ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য এবং শূদ্র, জন্মগত নয় I

“ব্রাহ্মণ আমার ভাই – চন্ডাল আমার ভাই – সবার শরীরে মানুষেরই রক্ত !” – (স্বামী বিবেকানন্দ)l

(শ্রদ্ধেয় শিক্ষক ডঃ সরূপ প্রসাদ ঘোষ মহাশয়ের বক্তব্যে অনুপ্রাণিত হয়ে, এই লেখাটি লিখেছেন – বাদল চন্দ্র সাহা ) !

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s