শ্রূতি আর স্মৃতি : তপন ঘোষ

অনেকেই ‘শ্রূতি’ আর ‘স্মৃতি’-র মধ্যে তফাৎ জানে না। ‘শ্রূতি’ শাশ্বত সত্য। আর ‘স্মৃতি’ যুগোপযোগী সত্য। এই দুইয়ের উপর ভিত্তি করে সুষ্ঠূভাবে সমাজ পরিচালনার জন্য যে সময়োপযোগী নিয়মকানুন তৈরী করা হয়, তার নাম ‘সংহিতা’। তাই কোনো সংহিতাই কখনোই চিরকালীন নয়। ঋষিমুনিরা যুগে যুগে পুরানো সংহিতা বাতিল করে, অথবা সংশোধন, সংযোজন ও পরিমার্জন করে নতুন সংহিতা চালু করেন। এই সংশোধন, সংযোজন ও পরিমার্জন হয় যুগোপযোগী। যাজ্ঞবল্ক্য সংহিতা, পরাশর সংহিতা, ভৃগু সংহিতা এবং এরকম আরো অনেক সংহিতা আগে প্রচলিত ছিল। সেই সংহিতা দিয়ে যদি এখন সমাজ চালাতে যাওয়া হয় – তাহলে বিপর্যয় ঘটে যাবে। ধৃতরাষ্ট্র ও পান্ডু দুজনেরই জন্ম হয়েছিল ‘নিয়োগ প্রথায়’। আজ ওই প্রথা চলবে? অবশ্যই না।
গত এক হাজার বছর আমরা হিন্দু জাতি ও হিন্দু দেশ যুদ্ধাবস্থায় ছিলাম। সেই সময় নরহত্যা, নারীধর্ষণ, লুন্ঠন ও ধর্মান্তরণের ঝড় বয়ে গিয়েছে আমাদের উপর। বাংলাদেশ, কাশ্মীর, কেরল, পশ্চিমবঙ্গ, আসাম, বিহার, উত্তরপ্রদেশসহ বহুস্থানে এখনো আমরা যুদ্ধাবস্থায় আছি। তাই গত হাজার বছরে আমাদের সংহিতা নির্মাণের প্রক্রিয়া ব্যাহত হয়েছে। শুধু ব্যাহত হয়নি, ভেঙে পড়েছে। ইতিমধ্যে জাতীয়, আন্তর্জাতিক, সামাজিক, ধর্মীয়, আন্তর্ধর্মীয় সম্পর্কের বহু পরিবর্তন হয়েছে। বিজ্ঞানের ব্যাপক উন্নতি হয়েছে। এই পরিবর্তনগুলি ব্যক্তি ও সমষ্টির (সমাজ) উপর বিশাল প্রভাব ফেলেছে।
তাই পুরানো সংহিতা সম্পূর্ণ ভাবে (১০০%) অকেজো হয়ে গিয়েছে। অথচ আমরা যুদ্ধাবস্থায় ও পরাধীন থাকার জন্য প্রয়োজনীয় নতুন কোনো ধর্মীয়-সামাজিক ‘সংহিতা’ রচিত হয়নি। তাই বলে শিক্ষিত সচেতন মানুষ (হিন্দু) চুপ করে বসে থাকে নি। তারা সমাজ পরিচালনার জন্য তাদের সাধ্যমত চেষ্টা করেছে। তার নামই দেশের সংবিধান। তাই দিয়েই কাজ চালানো হচ্ছে। এটা সর্বাঙ্গসুন্দর নয়, নিখুঁতও নয়। কিন্তু মন্দের ভাল। এখন সমাজ অভিভাবকদের দায়িত্ব নতুন সংহিতা তৈরী করা। তার জন্য অনেকে চেষ্টাও করছেন। হৈ চৈ না করে।
মনু সংহিতার কথা একটু না বললেই নয়। একে মনুস্মৃতিও বলা হয়। এটা ‘শ্রূতি’ নয়। সুতরাং তা শাশ্বত নয়। এর রচনাকাল খুব কম করে হলেও ২৫০০ বছর। ৫০০০ বছরও হতে পারে। এটা লিপিবদ্ধ হয়েছে অনেক পরে। আর ইংরাজী ও অন্য ভারতীয় ভাষায় অনুবাদ হয়েছে ১৭৯৪ সালে ও তার পরে। সুতরাং কেউই জোর দিয়ে দাবী করতে পারবেন না যে মূল মনুস্মৃতি অবিকৃত অবস্থায় পাওয়া যায়। আর যেটা পাওয়া যায়, সেটা একবার পড়ে দেখুন। বমি আসবে। হ্যাঁ। এই কথা আমি নিজের কানে শুনেছি স্বর্গতঃ অশোক সিংহলের মুখ থেকে।
তাই আজকে যদি কেউ সেই মনুস্মৃতি অনুসারে সমাজকে চালাতে বলে, তাহলে তাকে ডাক্তারি পরীক্ষা ক’রে হয় পাগলাগারদে পাঠাতে হবে। আর সুস্থ থাকলে জেলে পাঠাতে হবে।
হ্যাঁ, আমি জোর দিয়ে বলছি – বর্তমান সমাজে মনুস্মৃতি চলবে না, মনুসংহিতা চলবে না, মনুবাদ চলবে না।
শ্রীমতী মায়াবতী ও তাঁর অনুগামীরা পরম্পরাগত হিন্দু সমাজপদ্ধতিকে ‘মনুবাদী’ বলে গালি দেন। মায়াবতীর বিরোধিতা করতে গিয়ে জ্ঞাতসারে বা অজ্ঞাতসারে ‘মনুবাদ’-কে সমর্থন করা সম্পূর্ণ ভুল হবে।
হিন্দুসমাজের জন্য নতুন সংহিতা তৈরী করা সম্ভব কিনা বলা খুব কঠিন। কারণ, হিন্দুধর্মের কোন কেন্দ্রীয় প্রতিষ্ঠান নেই, যা অন্য ধর্মগুলোর মধ্যে আছে। দ্বিতীয়তঃ, অতীতকালেও যে সব সংহিতা রচিত হয়েছিল, তা সমাজে শুধু রাজশক্তি দ্বারা implemented হয়নি। স্মৃতিকারদের প্রজ্ঞা ও চারিত্রিক শ্রেষ্ঠতার দ্বারা সমাজে স্বীকৃত হয়েছিল। আজ সেরকম বিদ্বান, প্রজ্ঞাবান, চরিত্রবান ও ত্যাগী মানুষ হিন্দুদের ধর্মীয় সক্রিয়তার পরিধির মধ্যে খুবই কম।

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s